An Education Blog

word direction logo

ধান ক্ষেতে মাছ চাষ

aquaponics-article-fish-paddy-sizedখাদ্য শস্যের চাহিদা মিটিয়ে ব্যাপক আকারে মাছ চাষ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই খাল, বিল, নদী, পুকুর, ডোবা প্রভৃতি জলাশয়ের সঙ্গে ধান ক্ষেতে মাছ চাষ করতে পারলে দেশের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে এবং অপরদিকে ধান চাষীরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। আমাদের দেশে বছরের অধিকাংশ সময় পানি থাকে বা সেচ সুবিধা আছে এমন নিচু ধানি জমিতে মাছ চাষ করা যেতে পারে। এতে ধানের কোনো ক্ষতি হয় না। ধান ক্ষেতে মাটি, পানি, সার, গোবর প্রভৃতির সংমিশ্রণে প্রাকৃতিকভাবে যে খাবার তৈরি হয়, তা মত্স্য উত্পাদনের জন্য খুবই উপযোগী। তাই এরকম পরিবেশে ধান ক্ষেতে মাছ চাষ করে একজন চাষী ধান উত্পাদনের সঙ্গে সঙ্গে মাছ বিক্রি করে বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। ধান ক্ষেতে অল্প পানিতে রাজপুঁটি, নাইলোটিকা, মিররকার্প জাতীয় মাছ চাষ করা লাভজনক কারণ এ মাছগুলো অতি দ্রুত বর্ধনশীল, খেতে সুস্বাদু এবং বাজারমূল্য ভালো। এছাড়া দেশি মাছ যেমন—কই, টাকি, শোল, শিং, মাগুর, টেংরা, পুঁটি প্রভৃতি চাষ করা যেতে পারে।

ধান ক্ষেতে মাছ চাষের সুবিধাঃ-

১. একই জমিতে একসঙ্গে দুটি ফসল ধান ও মাছ পাওয়া যায়।
২. ধানের পোকামাকড় মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।
৩. মাছ চলাচল করে তাই ধানে আগাছা কম হয়।
৪. মাছের নড়াচড়াতে ধানের দ্রুত বৃদ্ধি হয় ও ফসল ভালো হয়।
৫, মাছের জন্য আলাদা খাদ্যের প্রয়োজন হয় না।
৬. অল্প পুঁজিতে অধিক কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।
৭. মাছের বিষ্ঠা সার হিসেবে ব্যবহার হয়।
৮. পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
৯. কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায়।

এ পদ্ধতিতে একই জমিতে ধান ও মাছ একই সঙ্গে চাষ করা যায়। দেশের প্রায় সর্বত্র বোরো ও আমন মৌসুমে মাঝারি, উঁচু ও নিচু জমিতে, যেখানে সাধারণত ৪ মাস থেকে ৬ মাস বৃষ্টির পানি জমে থাকে অথবা বোরো মৌসুমে সেচ সুবিধার আওতায় থাকে সেখানকার জন্য উপযোগী।

ধান ও মাছের মিশ্র চাষঃ- ধানের সঙ্গে মাছ চাষের পর্যায়ক্রমিক ধাপগুলো আলোচনা করা হলো :

ধানি জমি নির্বাচনঃ- জমি নির্বাচনের ওপর মাছ চাষের সফলতা নির্ভর করে। কারণ সব ধান ক্ষেত মাছ চাষের উপযোগী নয়। ধান ক্ষেতে মাছ চাষের জন্য কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—

১. যেসব জমির পানি ধারণক্ষমতা বেশি এবং বন্যার পানি প্রবেশ করে না এরূপ নিচু ও মাঝারি উঁচু জমি হতে হবে।
২. দোআঁশ অথবা বেলে দোআঁশ হলে ভালো হয় (অন্যান্য মাটিতে চাষ কঠিন হয়)।
৩. প্রয়োজনে গভীর অথবা অগভীর নলকূপ থেকে পানি দেয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৪. জমি রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা আছে এমন জায়গা হতে হবে।

জমি প্রস্তুতকরণঃ- উপযুক্ত সময়ে জমিতে চাষ ও মই দিয়ে ধান চাষের প্রচলিত নিয়মে জমি তৈরি করতে হবে। স্বাভাবিক নিয়মে জমিতে জৈব ও রাসায়নিক সার দিতে হবে। ধানের সঙ্গে মাছ চাষকালীন ক্ষেতের সব সংশে ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি পানি থাকা আব্যশক।

আইল বা বাঁধ নির্মাণঃ- ক্ষেতের চার পাশে উঁচু করে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে যাতে বাইরে থেকে বন্যার পানি প্রবেশ করতে না পারে বা ভেতরের পানি বাইরে না যায় (কমপক্ষে ১ ফুট উঁচু)। বন্যা বা অন্য কোনো কারণে ক্ষেতে পানি বেশি হলে জমির আইল কিছু অংশে বাঁশের বানা বা অন্য কোনো কিছু দিয়ে অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হবে।

গর্ত খননঃ- সাধারণত জমির যে অংশ বেশি ঢালু সে অংশে মোট জমির শতকরা ৩ থেকে ৪ ভাগ জমিতে ২ থেকে ৩ ফুট গভীর করে গর্ত খনন করতে হবে যাতে করে শুষ্ক মৌসুমে বা খরা মৌসুমে বা অন্য কোনো কারণে জমির পানি শুকিয়ে গেলে মাছ সাময়িকভাবে ওই গর্তে আশ্রয় নিতে পারে। তাছাড়া মাছ ধরার সময় সহজে একত্রিত করা যায়।

ধানের জাত নির্বাচনঃ- উচ্চফলনশীল যেসব ধান মাঝারি লম্বা এবং পানিতে হেলে পড়ে না সেসব জাতের মাছ চাষে সুবিধাজনক। যেমন—বিআর-১৪, বিআর-১, বিআর-২ ইত্যাদি।

পোনা মজুতঃ- ধান রোপণের ১০ থেকে ১৫ দিন পর জমিতে কমপক্ষে ৬ ইঞ্চি পরিমাণ পানি থাকা অবস্থায় ২ থেকে ৩ ইঞ্চি আকারের রাজপুঁটি, নাইলোটিকা অথবা মিররকার্পের পোনা প্রতি শতাংশে ১২ থেকে ১৫টি করে ছাড়তে হবে।যদি উভয় জাতের পোনা ছাড়তে হয় তাহলে ৬টি রাজপুঁটি বা নাইলোটিকা এবং ৬টি মিররকার্প হিসাবে ছাড়তে হবে। তবে শুধু রাজপুঁটি বা নাইলোটিকা ছাড়লে ২০ থেকে ২৪টি পর্যন্ত ছাড়া যেতে পারে।

পোনা ছাড়ার সময়ঃ- পোনা সাধারণত সকালে অথবা পানি যখন ঠাণ্ডা থাকে এমন সময় ছাড়া উচিত। পোনা ছাড়ার সময় ধান ক্ষেতের পানির তাপমাত্রা ও পাত্রের পানির তাপমাত্রার সমতায় এনে আস্তে আস্তে ছাড়তে হবে। ধানের চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর কুঁশি বের হওয়া শুরু করলে মাছের পোনা ছাড়তে হয়।

ধান ক্ষেতের যত্নঃ- ধানের সঙ্গে মাছ চাষ করলে সাধারণত আগাছা ও পোকা দমনের প্রয়োজন হয় না। কারণ মাছ আগাছা ও পোকা খেয়ে ফেলে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে মাছ গর্তে আটকিয়ে রেখে কাজ করতে হবে।

অন্যান্য ব্যবস্থাপনাঃ- ধানের সঙ্গে মাচ চাষের সময় ক্ষেতের সব অংশে ৫-৬ ইঞ্চি পানি থাকা দরকার। এ সময় মাছের জন্য বাড়তি কোনো খাবার দরকার হয় না, তবে মাছ তাড়াতাড়ি বড় করতে চাইলে নিয়মিত গোবর, ক্ষুদিপনা এবং মাছের দেহের ওজনের ২-৩ শতাংশ পরিমাণ চালের কুঁড়া দেয়া যেতে পারে।

মাছ আহরণ ও উত্পাদনঃ- সাধারণত ৩ থেকে ৪ মাসেই রাজপুঁটি, নাইলোটিকা ও মিনারকার্পের ওজন ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম হয়ে থাকে। ধান কাটার পর যদি ক্ষেতে পানি না থাকে তাহলে তখনই মাছ ধরা উচিত আর পানি থাকলে পরবর্তী ফসলের আগ পর্যন্ত ক্ষেতে মাছ রাখা যাবে। ধান ক্ষেতে সমন্বিত পদ্বতিতে মাছ চাষ করলে ৩ থেকে ৪ মাসেই প্রতি বিঘায় (৩৩ শতাংশে) ৪০ থেকে ৫০ কেজি (একরে ১২০-১৫০ কেজি) মাছ এবং ১০ থেকে ১৭ মণ (১.২ থেকে ২.০ টন) ধানের উত্পাদন পাওয়া যায়।

Source: http://goo.gl/1cCS9Y

Leave a Reply

Share this

Journals

Email Subscribers

Name
Email *